Opu Hasnat

আজ ১৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০২২,

সালথায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ফরিদপুর

সালথায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথায় ভূমিহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার সরকারি ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পঁচা ইট, খোয়া, নিম্নমানের রড, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে নির্মাণ কাজ হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশাসনের জব্দ করা সরকারি গাছের নিম্নমানের কাঠ। বেশিভাগ ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিযোগ রয়েছে- সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. তাছলিমা আক্তার তার স্বামী মো. শাহেদ চৌধুরীকে ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দিয়ে যা খুশি তাই করে রীতিমত নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। এখানে তৃতীয় ধাপে মোট ২৩৩টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫'শ টাকা প্রতিটি ঘর নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে। 

ইউএনও অফিস সুত্র জানা যায়, গৃহনির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির সভাপতি ইউএনও আর সেক্রেটারী পিআইও। সদস্য করা হয়েছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও প্রকৌশলীসহ ৮টি ইউপি চেয়ারম্যানকে। তবে এসব সরকারি কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানররা নাম মাত্র কমিটিতে থাকলেও তাদের কোন পরামর্শও নেয়া হয়নি। সব কিছু ইউএনও তার স্বামীর পরামর্শে করেছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক উপকারভোগী অভিযোগ করে বলেন, বেশিরভাগ ঘরেই নিম্নমানের ইট, খোয়া, বালু, রড, সিমেন্ট ও কাঠ দিয়ে কাজ করছেন। যা মাঝে মাঝেই ফেরত দেওয়া হয়। এক গাড়ি ভাল ইট-খোয়া আনলে, তিন গাড়ি খারাপ ইট-খোয়া এনে কাজ করছে। যেসব ঘর সড়কের পাশে বা সদরে সেসব ঘরে ভাল মানের সামগী ব্যবহার করলেও গ্রামের ভিতরের ঘরগুলোতে বেশিরভাগ নি¤œমানের মালামাল ব্যবহার করছে। 

তারা আরও বলেন- আবার অনেকস্থানে পরিকল্পনা ছাড়া ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। হাঁটাচলা করার মত জায়গা ছাড়া ঘরের আঁশপাশে কোন জায়গা খালি রাখা হয়নি। যেখানে শাকসবজি চাষ করে উপকাভোগীরা খাবে, সেই জায়গা পর্যন্ত রাখা হয়নি। ফলে এসব ঘরে বসবাস করতে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করেছেন। এসব বিষয় ইউএনওকে জানানো হলেও কোন লাভ হয়নি।

গৃহনির্মাণ কাজে কর্মরত মিস্ত্রিরা বলেন, ঘরের কাজের ইউএনওর স্বামী ঠিকাদার। সে যেভাবে বলে, সেইভাবে কাজ করি। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করলেও আমাদের কিছু করার নেই। আমাদের যেসব মালামাল এনে দিবে আমরা তাই দিয়ে কাজ করবো। এর বাহিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। 

অভিযোগ রয়েছে- সাবেক ইউএনও'র জব্দকৃত বন’বিভাগের যেসব গাছ উপজেলা চত্বরে রাখা ছিল। তাসহ কাগদী সড়ক, তুগুলদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটঘরের পুটিয়া ঈদগাহ-খেলার মাঠ থেকে বেশ কিছু মেহেগুনি গাছ কেটে ঘরের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। বন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই এসব গাছ নেয়া হয়।  

উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. তোরাপ হোসেন বলেন, উপজেলা চত্বরে যে গাছ রাখা ছিল তা ওয়ার্কশনে (নিলামে) বিক্রয় করেন আগের ইউএনও হাসিব সরকার। তবে, শুনেছি মাঝারদিয়া ও সোনাপুর এলাকায় কিছু গাছ কেটেছেন বর্তমান ইউএনও তাছলিমা আক্তার। তবে, সে গাছ তিনি কি করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে এ বন কর্মকর্তা বলেন, ইউএন তাছলিমা স্যার যে গাছ কেটেছেন তা বনবিভাগের আওতাধীন নয়। সেগুলো খাস খতিয়ানের জায়গার, তাই হয়তো সে আমাদের জানাননি। 

তবে সাবেক ইউএনও হাসিব সরকার বলেন- উপজেলা চত্বরে যেসব গাছ ছিল সেগুলো বন’বিভাগের। আমি থাকতে এসব গাছ আমি ওয়ার্কশনে (নিলামে) বিক্রয় করিনি মনে হয়।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে উপজেলা ও ইউনিয়ন ভুমি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, ঘর নির্মাণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তা দিয়ে সম্পন্ন কাজ করা সম্ভব। তারপরেও আমাদের ঘরের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। অফিসের কাজ রেখে প্রতিদিন আমাদের ঘর নির্মাণের কাজে সহযোগিতা করা লাগে। এমনকি ঘরের দেয়ালেও পানি দিয়ে ভেজাতে হয় আমাদের। 

গৃহনির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটির সেক্রেটারী ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পরিতোষ বাড়াই বলেন, উপজেলার জয়ঝাপ এলাকায় গৃহনির্মাণ কাজে কিছু নিম্নমানের সামগ্রী আনা হয়েছিল। পরে তা ফেরত পাঠানো হয়। আর কোনো অনিয়মের বিষয় আমি অবগত নই।
 
গৃহনির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটির অন্য সদস্য উপজেলা প্রকৌশলী তৌহিদুর রহমান বলেন, গৃহনির্মাণ কাজে আমাদের সেইভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, এটা আপনারা জানেন। আমি একদিন ইউএনও ও পিআইও'র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) সাথে জয়ঝাপ গিয়েছিলাম। সেখানে নিম্নমানের খোয়া পাওয়া গেলে তা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। গৃহনির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে কি না- এটা আমার চেয়ে আপনারা ভাল জানেন। আমি এ বিষয় আর কিছু বলতে চাই না। 

স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ জানান, উপজেলার গট্টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রচুর পরিমাণ অব্যবহৃত জমি থাকার পরেও লক্ষণদিয়া গ্রামে এজাজ আহমেদ নামে তরুণ এক উদ্যোক্তার একটি গরুর ফার্ম ভেঙ্গে সেখানে ঘর নির্মাণ শুরু করেন। ফার্মটি ভেঙ্গে ফেলায় ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিসহ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় ওই তরুণ উদ্যোগক্তার স্বপ্ন। 

মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি এলাকায় কুমার নদের পাড়ের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান বলেন, আমিসহ আমার পাশপাশের অন্তত ১০ জন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিচু জমি দখলে নিয়ে অন্তত ১০ লাখ টাকার বালু-মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে গাছ লাগাই। গাছগুলো অনেক বড় হয়ে উঠে। সেই গাছ কেটে জায়গা খালি করে সেখানে ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

অন্যদিকে, উপজেলা ফুকরা বিদ্যুৎ অফিসের সামনে নিচু জায়গা মাটি ভরাট করে গৃহ নির্মাণ করার কথা। এই জন্য আলাদা বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। অথচ সেই নিচু জায়গাতেই গৃহ নির্মাণ করা হচ্ছে। জানালা-দরজা পাতলা লোহা দিয়ে করা হচ্ছে। শিডিউলে মোটা লোহা ধরা। ২ শতক জায়গাসহ ঘর দেয়ার কথা থাকলেও কিছু কিছু ঘর এক শতক জায়গায় তোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫০টি ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। অথচ ২৬ এপ্রিল ১৩৫ টি ঘরের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে হস্তান্তর করেছেন।

ইউএনও'র স্বামী মো. শাহেদ চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গৃহ নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা: তাছলিমা আক্তার গণমাধ্যমকর্মীদের জানান- ইট, খোয়া, বালি ও সিমেন্ট উপজেলা প্রকৌশলী ও পিআইও কতৃক পরিক্ষা করার পর তা ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সবই মানসম্মত। ১-২ গাড়ি নিম্নমানের খোয়া ফেরত দেয়া হয়েছে, তা কারো অভিযোগের ভিত্তিতে নয়। জব্দ করা কাঠ ব্যবহারের বিষয় পরিস্কার কিছু না বলে তিনি জানান- সাইজ করা সিজনিং ইউক্যালিপ্টাসের কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে। 

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে গৃহনির্মাণে কাজের বিষয় ইউএনও জানান- ঘরের গুণগত মান ঠিক রাখতে আমার অফিসের স্টাফ, পিআইও, এসিল্যান্ড অফিস ও প্রকৌশলীর স্টাফ নিয়মিত তদারকি করতে হচ্ছে, এটা আমাদের দায়িত্ব। বিনাপারিশ্রমিকে উপকারভোগীদের কাজ করানোর বিষয় তিনি জানান- অদ্যাবধি ২৩৩টি ঘরের মধ্যে কোন উপকারভোগী দিয়ে ঘরের ফ্লোর ভরাট করা হয়নি। আর বেদখলকৃত খাস জায়গা উদ্ধার করা এসিল্যান্ডের অন্যতম দায়িত্ব কর্তব্য। গৃহনির্মাণ কাজে স্বামীর দায়িত্বের বিষয় তিনি জানান- আমার হাজবেন্ড শাহেদ চৌধুরী একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, যিনি দেশের বাহিরে বিজনেস ভিসায় যাতায়াত করেন। কতটা সুরক্ষিত ও স্থায়ী ব্যবসা থাকলে একজন ব্যক্তিকে বিজনেস ভিসা দেয়া হয়।   

ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, গৃহনির্মাণের বিষয় অনিয়ম হলে লিখিত অভিযোগ দেন। বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখছি। অনিয়মের সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।