Opu Hasnat

আজ ১৬ জুন বুধবার ২০২১,

বদলে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র, চালু হচ্ছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন খাগড়াছড়ি

বদলে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র, চালু হচ্ছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় কিছুটা দেরীতে হলেও বদলের হাওয়া লেগেছে ৯টি উপজেলার স্বাস্থ্য খাতে। নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে এ জেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা। বর্তমানে সমতলের অনেক জেলাকে ছাপিয়ে গেছে এখানকার সেবার মান।

পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে জরুরী ঔষধ সরবরাহ্, প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র ও অক্সিজেন সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রোগীদের সেবা দিতে প্রানান্তর প্রচেষ্ঠা রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব ব্যক্তিরা।

এছাড়া আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকেও কঠোর নজরদারিতে রেখেছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা। করোনা রোগীদের জন্য আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে যুক্ত করা হয়েছে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার, হাই-ফ্লো-ন্যাজাল ক্যানোলাসহ অক্সিজেন কনসেনট্রেটর। ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন। আর আর খুব সহসাই এর সাথে সংযোজন হতে যাচ্ছে আইসিইউ ইউনিট।

সদ্য স্থাপিত এই অক্সিজেন প্ল্যান্টটি চালু হয়েছে এক সপ্তাহের মধ্যেই। প্রায় ছয় হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার প্ল্যান্টটি চালু হওয়ায় তা থেকে একসঙ্গে সুবিধা পাবেন ১৫৬জন করোনায় আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগী। এছাড়া আইসিইউর জন্য ইউনিট স্থাপনের কাজও শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। এই দুটি ইউনিট চালু হলে অক্সিজেন কিংবা আইসিইউ সুবিধার জন্য আর শহরমুখি হতে হবে না এ জেলার মানুষদের।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সর্বশেষ ধাপ হলো আইসিইউ সেবা। সদর হাসপাতালে কোন আইসিইউ ইউনিট ছিলো না। আইসিইউ সেবা দিতে হলে এখানে একটি আলাদা ইউনিট প্রয়োজন। ইতোমধ্যে একটি ওয়ার্ডকে সংস্কার করে আইসিইউ ইউনিটের জন্য প্রস্তুুত করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিইউ শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। খুব সহসাই এখানে আইসিইউ সেবা চালু করতে সক্ষম হবেন বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা: নূপুর কান্তি দাশ। তবে আইসিইউ ইউনিট পরিচালনার জন্য দক্ষ কানসালটেন্ট এবং দক্ষ নার্স প্রয়োজন। সেই সংকট উত্তরণের জন্যেও সর্বোচ্চ প্রচেষ্ঠা রয়েছে তাদের।

অপরদিকে গত ২৪ঘণ্টায় খাগড়াছড়িতে আরো তিন জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এনিয়ে জেলায় বর্তমানে ৬১জন ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত রয়েছেন। এদের মধ্যে ৫জন খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। অন্যরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ নিজ বাসায় রয়েছেন। এই নিয়ে জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৮শ ৬৪জন। সুস্থ হয়েছে ৮শ ৩জন।

অন্যদিকে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে চালু হচ্ছে সেন্টাল অক্সিজেন প্লান্ট। ১০০শয্যার হাসপাতালটিতে ইতোমধ্যে প্রায় সব ধরনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও দ্রæুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ইউনিট চালুর বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে জেলার ৯টি উপজেলার বাইরেও রাঙামাটির বেশ কয়েকটি উপজেলার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে। এই হাসাপাতালে সরকারি অর্থায়নে বসানো হচ্ছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন ও অব্যাহত রাখতে এই উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। কাজটি বাস্তবায়ন করছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর(এইচইডি)। কাজটির বরাদ্দ ধরা রয়েছে ৩কোটি ৬৫লাখ ৩৯হাজার ৬৯৮টাকা। 

হাসপাতালের পেছনে প্রায় ৬হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করেছে। ১০০শয্যার হাসপাতাল হলেও এখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন থেকে ১৩৯টি পোর্ট রাখা হয়েছে। প্লান্টের বাইরে বিকল্প হিসেবে ৪৮টি বড় সিলিন্ডার স্থাপন করা হয়েছে। প্লান্টে অক্সিজেন না থাকলেও সিলিন্ডার থেকেও হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ করা যাবে।

খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা: রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, ‘করোনা ছাড়াও আগে রোগীদের জন্য অক্সিজেন সেবার প্রয়োজন হতো। আমরা তখন রোগীদের অক্সিজেন সেবা দিতে পারতাম না। করোনার কারণে সেই সংকট দিন দিন আরও বাড়ছিলো। তবে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন আমাদের সেই হতাশা দূর করেছে। আশাকরি প্ল্যান্টটি চালু হওয়ায় রোগীরা দারুণভাবে উপকৃত হবেন।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই এখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে চালু করা সম্ভব হল এই সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট। এখান থেকে একযোগে জরুরী অক্সিজেন সেবা নিতে পারবেন ১৫৬জন রোগী। এই প্ল্যান্টটি চালু হওয়ায় আমরা করোনা আক্রান্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারবো। আর আইসিইউ ইউনিট চালু হলে তা আরও পূর্ণাঙ্গভাবে সমৃদ্ধ হবে।’

তিনি আরও বলেন, করোনার আগেও আমরা রোগীদের আমরা পর্যাপ্ত অক্সিজেন সেবা দিতে পারতাম না। কিছুদিন পর পর চট্টগ্রাম থেকে রিফিল করে আনতে হতো। এখন সেন্ট্রাল অক্সিজেন চালু হলে হাসপাতালে রোগীদের সেবা আরও সহজ হয়ে যাবে। হাসপাতালে দুটি ভেন্টিলেটর রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হবে।

হাসপাতালে আলোর মুখে আইসিইউ। হাসপাতালে আইসিইউর জন্য ৬বেডের একটি ইউনিট প্রস্তুুত রাখা হয়েছে। এখানেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন সংযুক্ত রাখা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা: নূপুর কান্তি দাশ বলেন, ‘খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালটি ১০০শয্যার হলেও এখানে জনবল রয়েছে ৫০শয্যার সেবা দেয়ার মতো। তবুও আমরা এই স্বল্প সংখ্যক জনবল নিয়েই এখানে অন্যান্য রোগীদের পাশাপাশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, আমরা দুটি ভেন্টিলেটর পেয়েছি। সেন্ট্রাল অক্সিজেনও সহসা চালু করতে পারবো। এখন আইসিইউর জন্য ইউনিট স্থাপনের কাজও শেষ করেছি। আশা করি, সব ঠিক থাকলে আইসিইউ স্থাপনের কাজও খুব দ্রুত শুরু করা যাবে। এতে জেলাবাসী চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। 

খাগড়াছড়ির স্বাস্থ্যখাতের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য বিভাগের আহবায়ক এমএ জব্বার। জেলা সদর হাসপাতালসহ সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিতভাবেই তদারকি করছেন তিনি। দিনে-রাতে সমানতালে প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ সহযোগিতা করে চলেছেন নিরলসভাবে।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য বিভাগের আহবায়ক এমএ জব্বার বলেন, ‘এই কোভিড পরিস্থিতিতে আমরা স্বাস্থ্য খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আমরা চাই এ জেলার একটি মানুষও যেনো চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ না করেন। ধীরে ধীরে আরও সমৃদ্ধ করা হবে চিকিৎসা খাতকে।’

তিনি বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত প্রায় ৯৫শতাংশ রোগীই সাধারণ চিকিৎসাতে সুস্থ্য হয়ে ওঠেন। এই দুটি ইউনিট চালু হলে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে সমৃদ্ধ হবে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল। আমরা সেই লক্ষ্যেই সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা করে চলেছি।’

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে সেবা মানে চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম স্থানের মর্যাদা পেয়েছে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল। মানের দিক বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পর্যায়ে ম্যানেজম্যান্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) সেবার মান নির্ণয়ের স্কোরে ২০১৯সালে প্রথম হয়েছে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল।

এছাড়া সারাদেশের মধ্যে স্কোরে ১১তম অবস্থান রয়েছে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নতুন কেবিন স্থাপন, ডাক্তার, নার্সদের রোগীর প্রতি আন্তরিকতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহ্, শিশু রোগীদের জন্য স্পেশাল কেয়ার স্থাপন, রোগী পরিবহনে নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংযোজনসহ নানা কারণে দৃষ্টি কেড়েছে জেলাবাসীর। আগের চেয়ে অনেকাংশেই কমে গেছে রোগীদের চিরাচরিত দুর্ভোগ।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর