Opu Hasnat

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর রবিবার ২০২১,

পল্লী বিদ্যুতের নতুন চ্যালেঞ্জ অফগ্রীড মতামত

পল্লী বিদ্যুতের নতুন চ্যালেঞ্জ অফগ্রীড

মো. আবুল হাসান : দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যে  ২০১৪ সাল থেকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন (ডিএনই) প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যাচ্ছে । উক্ত প্রকল্প সমাপনান্তে দেশের মোট গ্রাহক ৪ কোটি গ্রাহকের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের ৩ কোটি ১২ লক্ষ গ্রাহককে (৭৮%) বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে দেশের ৯৯.৫% গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিছু কিছু নদী ও সাগর বক্ষের প্রায় ১৫ লক্ষ জনগনকে বিদ্যুৎ দিতে না পারলে মুজিব বর্ষেই শতভাগ বিদ্যুতায়নের মূল লক্ষ অপূর্ণ থেকে যাবে। এ লক্ষ্য অর্জনে পল্লীবিদ্যুৎ কে আবারও অফগ্রীড এলাকায় বিদ্যুতায়নের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়েছে। ইতিমধ্যে সোলার হোমস সিষ্টেম এর মাধ্যমে কিছু কিছু অফগ্রীড এলাকায় আবাসিক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও কৃষিতে সেচ, শিল্প ও বানিজ্যিক ক্ষেত্রে জাতীয় গ্রীডের বিদ্যুতের সাথে সংযুক্ত করা সম্ভব না হলে চরাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে কখনই উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত করা যাবে না। 

কিন্তু সাগর কিংবা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে কোন দ্বীপ কিংবা চরাঞ্চলের অফগ্রীড এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা একটি কারিগরী ও আর্থিক ভাবে একটি দুরহ কঠিন কাজ। ইতিপূর্বে চীনের কারিগরী সহায়তায় সাগর দ্বীপ সন্দ্বীপে 
 
সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের নজির থাকলেও নদী মার্তৃক  বাংলাদেশের অসংখ্য নদীর পলি বাহিত চরে গড়ে উঠা  ভাগ্যহত জনগনের ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা শুধু কঠিনই নয় বরং অধিকতর চ্যালেঞ্জিং। অবশেষে বাংলাদেশ  পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং তার ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ‘‘ শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’’ কর্মসূচী বাস্তবায়ন কল্পে দেশের সমগ্র চরাঞ্চলে তথা অফগ্রীড এলাকায় বিদ্যুতায়নের সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নদীমার্তৃক বাংলাদেশের ছোট বড় প্রায় ৭০০ নদ-নদী থাকলেও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, তেতুলিয়া, বলেশ্বর, বিশখালী প্রভৃতি নদ-নদীর মধ্যে জেগে উঠা ২২১ টি ইউনিয়ন যা দেশের মোট ৪৫৭১ টি ইউনিয়নে প্রায় ৫ শতাংশ এলাকায় প্রায় ১৫ লক্ষ জনগন বসবাস করে । তাদেরকে গ্রীডের সাথে যুক্ত করতে হলে সে সমস্ত চ্যালেঞ্জ  মোকাবেলা করতে হবে। তন্মধ্যে প্রথমত নদীর তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা এবং তার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষন করা । দ্বিতীয়ত নদীর দূর্গম এলাকায় যেখানে এখনও কোন রাস্তাঘাট গড়ে উঠে নাই, চর এলাকায় পলিবাহিত হালকা মাটিতে বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন করা এবং তা রক্ষণাবেক্ষন করা। তৃতীয়ত বর্ষায় যখন দু’কুল ছাপিয়ে বন্যা সমগ্র এলাকা পানিতে ডুবে যায় তখন গ্রীড লাইনকে সচল রাখা অত্যন্ত  ঝুকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।
তবুও জাতির পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রেখে চলমান মুজিব বর্ষেই শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতায়নের স্বপ্নে বিভোর পল্লী বিদ্যুৎ।  তাই যে কোন ঝুকি নিতেও তারা প্রস্তুত।
 
সারা দেশের  চরাঞ্চলগুলি ২২ টি জেলার ২২১ টি ইউনিয়নে ১০৫৯টি গ্রামে বিস্তৃত যা ২৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) বাস্তবায়ন করছে। অফগ্রীড এলাকায় সমগ্র প্রক্রিয়াকে ৩টি ফেজে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ফেজে ৬৪৬ টি, দ্বিতীয় ফেজে ৩৮৪ টি এবং তৃতীয় ফেজে ২৯ টি গ্রাম বিদ্যুতায়নের কাজ  দ্রুত গতিতে  এগিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন নদীতে ৮৭ টি ক্রসিং পয়েন্টে মোট ১৭৪ সার্কিট কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ প্রায় সমাপ্তের পথে । যার আওতায় ৭ হাজার ৯৭১ কিঃ মিঃ লাইন নির্মাণ করে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার গ্রাহককে সংযোগ প্রদান করা হবে। এজন্য পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। 

ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ফেজের কাজ প্রায় ৭০% সমাপ্তির পথে।  তৃতীয় ফেজে ২৯ টি গ্রাম সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সংযোগ করা কারিগরী ও আর্থিক ভাবে গ্রহনযোগ্য না হওয়ায় ০৯ টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) আওতায় সোলার হোমস  স্থাপন করা হচ্ছে। 

স্বাধীনতা উত্তর দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ প্রদানের যে অঙ্গীকার ছিল আজ তারই যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়ন করছে বিদ্যূৎ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রীড এলাকায় ২০১৪ -২০২০ সালের মধ্যে মাত্র ৬ বছরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের ২ লক্ষ ২৮ হাজার কিঃ মিঃ লাইন থেকে ৫ লক্ষ ৩০ হাজার কিঃ মিঃ লাইন নির্মাণ করে পুর্বের ৭৪ লক্ষ(২৭%) গ্রাহক থেকে ৩ কোটি ১১ লক্ষ গ্রাহক তথা (৯৯.৫%) মানুষকে সংযোগ প্রদান করে জাতিকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের দ্বারপ্রান্তে।  আর বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে অফগ্রীড এলাকায় বিদ্যুতায়নের  চ্যালেঞ্জ মোকবেলা করেই চলতি মুজিব বর্ষেই জাতিকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন উপহার দিতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। যা ইতিমধ্যে দক্ষিন এশিয়ার সকল দেশকে টপকিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। 

লেখক : মহাব্যাবস্থাপক, ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।