সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : চরমপন্থা নয়, বরং সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যই একটি সুন্দর, গোছানো এবং সফল জীবনের মূল ভিত্তি। আজ আমি ইফটিজিং নিয়ে কথা বলব না, বলব না হত্যা-ধর্ষন এবং খুন নিয়ে। কেননা এ বিষয়ে প্রতিবারই বহু প্রবন্ধ প্রকাশ হয়ে থাকে এবং হচ্ছে। আমি সামান্যটুকুু শিকড়েরের গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখতে চাই, যে আঙিনার দর্শন থেকে জীবন বেড়ে উঠে এবং যে আঙিনার দর্শনে প্রবেশ করে জীবন শেষ হয়। দুই আঙিনার দর্শনই পারে একটি ভারসাম্য ও সুন্দর একটি জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে।

প্রবেশ করি পারিবারিক দর্শনে-। শিশু একটি কোমল হৃদয়। এ হৃদয়ে তাদের ভাবনার শেষ নেই। শিশুর ভাবধারার খেলাঘর হচ্ছে কৌতুহল। অফুরন্ত আনন্দ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে শিশুরা বেড়ে ওঠে। এ বেড়ে ওঠার সময় তাদের বুদ্ধির সাথে সুষ্ঠ বিকাশের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার পরিচয় ঘটে। কিন্তু তারও অনেক আগেই অর্থাৎ জন্মের পর থেকেই শিশুর পরিচয় ঘটে মা-বাবা এবং ভাই-বোনের সাথে। আবার অনেকের বড় পরিবারের সদস্যদের সাথে। এ পরিচয় ঘটা শুধু শুধু নয়, বরং এটি শিশুর মনোবিকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র বা বিদ্যালয়। কেননা শিশুদের প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন তার অভিভাবক। কোমলমতি শিশুরা ভীষণ কৌতুহলী। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক সুস্থ দর্শনে বেড়ে ওঠার জন্য মাতা-পিতার সহযোগিতায় শিখতে পারবে ভাই-বোনের একে অন্যের প্রতি দাযিত্ব, সহযোগিতা, মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি, সকল সৃষ্টির প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং মমত্ববোধ। জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে- তা হোক চিন্তা-ভাবনা, কর্মক্ষেত্র, সম্পর্ক বা খাদ্যাভ্যাস- অতিমাত্রায় কোনো কিছু করা বা পুরোপুরি বর্জন করা, উভয়ই নেতিবাচক বা কোন্টা ইতিবাচক তা জানার এবং শেখার কেন্দ্রই হচ্ছে পরিবার। পারিবারিক দর্শন বা ফ্যামিলি ফিলোসফি হলো একটি পরিবারের মূল্যবোধ, বিশ্বাস, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান এবং ভালোবাসা, যা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রাকে পরিচালিত করে। কিন্তু সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনধারা বজায় থাকবে কিভাবে? কেননা বহু পরিবার এসব জীবন দর্শনের বাইরে এসে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত। এসব কারণে অভিভাবকের চিন্তাভাবনায় শিশুদের সাথে আচরণে নমনীয়তার অভাব দেখা দিচ্ছে। কখনও দেখা যায় অতিমাত্রায় আনন্দ পাওয়ার পিছনে অন্যের লাইফস্টাইলকে অনুকরণ করে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে- এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতার বহুলাংশে প্রতিবন্ধকতায় চরম হতাশা নেমে আসে। আর এ হতাশার বহি:প্রকাশ ঘটে কোমলমতি শিশুদের ওপর। ঠিক তখন থেকে পারিবারিক দর্শন কিছুটা বিলুপ্ত হয়ে পরিবারের সদস্যদের অবচেতন মনে রুপ নেয় পারিবারিক সহিংসতা, নির্যাতন, একে অন্যের প্রতি অসম্মান, একে অন্যের কথা না শোনা। পরস্পরের মতামতের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো, আবার যেকোনো বিষয়ে একদম চরম বা কড়া অবস্থানে অনড় থাকা। বহু পরিবারের এমন অবস্থা দেখে দেখে বা এসবের ভিতোর দিয়ে শিশুরা বড় হয়ে ওঠে। পরবর্তী জীবনে এসব ভুল শিক্ষার মানসিকতার জীবনাদর্শে পুত্র শিশুদের বিপথগামী হতে শেখায়। এর শিকার হয় কন্যাশিশুরা। শুধু তাই নয়, জনসংখ্যা অত্যাধিক হারে বৃদ্ধি পওয়ায় অল্প জায়গায় বহু পরিবার বসবাস করছে। এসব ঘনবসতি এলাকায় ধর্ষন এবং ইফটিজিং এর মত অন্যায় কাজের সংখ্যা বাড়ছে। এখানেও যদি পারিবারিক মূল্যবোধ থাকে তবে এমন কাজ কমে আসবে বলে প্রত্যাশা সর্বস্তরের জনগণের।

এছাড়াও তৃণমূলে বেশিরভাগ পরিবারে গর্ভবতী নারীকে যে পরিমানে ঘরের কাজ করানো হয় সেই পরিমান আরাম এবং পুষ্টি প্রদান করা হয় না। এমনটি করার পিছনে নেতৃত্ব প্রদান করেন অই পরিবারের বয়জোষ্ঠ নারী। এ বঞ্চনা এবং অবহেলা নারীকে অধস্তনে নিয়ে যায়। সে তখন অসুস্থ্য মানসিকতায় তার সন্তানকে বড় করে তুলে। এভাবেই দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু নারী বঞ্চনা এবং নির্যাতনের মত সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র পরিবারের কারাগারেই বন্দি হয়ে থাকছে। নারীকে টেকসই হতে হলে পরিবারের মধ্যে থেকেই তাকে সুশিক্ষিত হতে হবে। শুধু শিক্ষিত নয়, সুশিক্ষায় পারবে নারীর প্রতি পাহাড় সমান বৈষম্যের অবসান ঘটাতে। তবেই শিশুরা বেড়ে ওঠার পথে নানামূখি সমস্যা হতে পরিত্রাণ পাবে এবং তাদের সম্ভাবনাময় স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

পারিবারিক মূল্যবোধ ও সুশিক্ষা থাকলে কন্যাশিশুর প্রাইভেট টিউটার পড়ানোর সময় মা’কে পাহারা দিতে হবে না। (যদি প্রাইভেট টিউটার পারিবারিক মূল্যবোধে বেড়ে ওঠেন) তখন নির্বিঘ্নে মামা, খালু, ফুপা ও চাচার সাথেও কন্যাশিশু নিরাপদ থাকবে। বর্তমান সময়ে সুশিক্ষার ভীষণভাবে অভাববোধ করছে সমাজ। যতদিন এই নৈতিকতার অবক্ষয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটবে না ততদিন কন্যাশিশু, নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষন, খুন কমে আসবে না। অত্যন্ত গভীর ও বাস্তব এমন চিত্র সমাজের সবখানেই দেখা দিচ্ছে। নৈতিকতার অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি যে কোনো সমাজের শান্তি ও সুরক্ষাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত সত্য। এ চিত্র না কমলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দিনের পর দিন পাগলা ঘোড়ার ন্যায় বেড়ে ভয়াবহ স্থায়ী রুপ ধারন করবে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সমাজে মূলত কয়েকটি স্তরে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি:
*    নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের উদ্দেশে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
*    অপরাধী যেই হোক না কেনো, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত হয়ে অপরাধের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
*    যেকোনো অন্যায় বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লা ও সামাজিকভাবে সম্মিলিত প্রতিরোধের জন্য ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গণসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস না পায়।

পারিবারিক দর্শনের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে মুক্ত ও একে অন্যের সাথে সুস্থ যোগাযোগ, উন্মুক্ত আলোচনা অর্থাৎ খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ। পরিবারের ছোট সদস্য থেকে শুরু করে বড় সদস্যের থাকবে নিজস্ব মতামত, অনুভ‚তি এবং মর্যাদার স্বীকৃতি। এমনটি না হলে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি হয়ে উঠতে পারে না। এ কারণে পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবার মতামত এর অভাব দেখা দেয় এবং যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চর্চা তখন আর থাকে না। তখন অহিংস পরিবেশ রাগ, চিৎকার, মানসিক নির্যাতন এমনকি শারীরিক নির্যাতনে রুপ নেয়। এভাবে পরিবারগুলো সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলে। এসব পরিবারের কন্যাশিশুরা নিজেকে কিভাবে টেকসই করে গড়ে তুলবে, যেখানে তাদের নিরাপদ আশ্রয় নড়বড়ে হয়ে ওঠে।

মানুষ মানুষের জন্য এ জীবন দর্শনের পুরোটাই পরিবারের মধ্যেই নিহীত। স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব ও অধিকারের ক্ষেত্রে অথবা পুত্র সন্তান ও কন্যাসন্তানের গৃহস্থালির কাজ অথবা অর্থনৈতিক দায়িত্বে বৈষম্য নয় মূল্যায়ন থাকাটাই শ্রেয়, সেই সাথে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা আবশ্যক। এমন সুন্দর সুশিক্ষা তো পারিবারিক বিদ্যালয় থেকে আসার কথা।
যেখানে পারিবারিক সংকট বা দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান আসে না সেখানে শিশুদের মধ্যে অহিংস ও বৈষম্যহীন আচরণ কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব? পারিবারিক দর্শনের কোন্ দিকটি নিয়ে আলোচনা করব? মেকি চকচকে আধুনিকতার ঘরে-বাইরে ভদ্রতা, বিনয়, ধীরতা, স্নেহ, গুরুজনের প্রতি ভক্তি বেমালুম ভুলে আত্ম-গৌরবে ফুলে- ফেপে থাকার নজীরটাই ইদানিংকালে দেখা যাচ্ছে। অনেকাংশে অসহিঞ্চু কর্কশ এবং ঝাঁঝালো কথাও শুনতে হচ্ছে অনেককে। এ দৃশ্য সমাজের প্রায় সব শ্রেণিতে। মনে হয় যেন প্যাথডিন নিয়ে আধো ঘুমে আধো জেগে আকাশে ভাসছে আর ভাসছে। এ ঘুনে ধরা ব্যাধি সমাজে ক্রমাগত বাড়ছে। হবেই না কেনো, আমরা যাঁরা আধুনিক পিতা-মাতা নিজেদের এনালগ ও ডিজিটালের বন্ধনে আছি বলে দাবির সাথে গর্ব করি। কখন যে নিজের অজান্তে নিজেদের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের ধাক্কা দিয়ে ডিজিটাল দুনিয়াতে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, তাঁদের শ্রেষ্ঠতর প্রমাণে এতটাই ব্যস্ত যে, যখন কোনো নিকট অথবা দূরের আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসেন, তখন তাঁদের কাছে এসে বসা-দুটো কথা বলা, ভালো-মন্দ গল্প করাতো দূরের কথা, তাঁদের পড়ার টেবিল হতে উঠে আসা নিষেধ। কারণ একটাই সময় নষ্ট হবে। আর সময় নষ্ট হলে পড়ার ক্ষতি হবে। এ আশংকায় অভিভাকগণ নিজস্ব একটি দর্শনশাস্ত্র তৈরি করেছেন। দিনের পর দিন এ দর্শনেই বেড়ে উঠ্ছে আমাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা। সমাজের এ ঘূনেধরা দর্শনশাস্ত্র এখন প্রায় বাড়িতেই দেখা যায়। তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এখন আর দাদি, ফুপি, খালা, মামা, চাচা-চাচির বাসায় গিয়ে ঈদ কুশল বিনিময়ের সময় করে ওঠতে পারেন না। সন্তানেরা বঞ্চিত হয় এসব আত্মীয়ার ভালোবাসা, স্নেহ ও প্রীতি থেকে। কোথাও কোথাও এসব আত্মীয়র শুধু কোনোভাবে নামই শুনেছে, কখনও দেখার সময় হয়ে ওঠে নাই আদরের সোনামনিদের। হোক না তারা একই শহরে। এসব সোনার ছেলে-মেয়েরা জানে, বাবা-মা ছাড়া তাদের ভালোবাসার মানুষ শুধু বন্ধু।

শুধু নারী কিংবা শুধু পুরুষ নিয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র নয়। সামাজিক এই অবক্ষয় রুখতে এবং একটি নিরাপদ সমাজ গঠন করতে হলে মূল সূত্রে যেতে হবে সবাইকে। তাই মূল সূত্র হচ্ছে প্রত্যেকটি মানুষের নূন্যতম মর্যাদা রয়েছে। মানব বান্ধব পরিবেশ যথাথভাবে গড়ে উঠলেই নারী বান্ধব পরিবেশ বা কন্যাশিশু পরিবেশ গড়ে উঠবে। এর জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের পূর্বে প্রয়োজন প্রত্যেকটি পরিবার সংস্কারের, প্রত্যেকটি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল সংস্কারের। তবেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে সবাই এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বলয় থেকে মুক্তি পাবে সমাজ। এমন সুন্দর একটি পরিবেশ গড়ে উঠলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা যায়: কন্যাশিশুরা বেড়ে উঠার পথে নানামূখী সমস্যা হতে পরিত্রাণ পাবে এবং তাদের সম্ভাবনাময় কাঙ্খিত স্বপের প্রাসাদ বাস্তবায়িত হবে।

লেখক পরিচিতি: কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, গবেষক এবং লিটিলম্যাগ সম্পাদক ও প্রকাশক।