বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাধারণ ভবিষ্যত তহবিলের (জিপিএফ) প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সময়ে এই কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তারা ভুয়া বিলের মাধ্যমে এ অর্থ তুলে নেন। সরকারি টাকা লোপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় বর্তমান বাগেরহাট জেলা হিসাবরক্ষন কর্মকর্তা সহ তিনজন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং দুজন সাবেক অডিটরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে জালিয়াতি চক্রের সাথে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (সাবেক) মোস্তাফিজুর রহমান ও অফিস সহকারী মোতালেব এর নামও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের মুখে শোনা যাচ্ছে এছাড়াও এ অপকর্মে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কেউ জড়িত থাকতে পারে বলেও ধারনা করা হচ্ছে।
বুধবার (১৬ অক্টোবর) বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয় এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশের মাধ্যমে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯, উপধারা-১ অনুযায়ী ওই ৬ জনকে বরখাস্ত করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা মোট ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল থেকে আত্মসাৎ করেছেন। আদেশে বলা হয়েছে, বরখাস্ত থাকাকালীন তারা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।
বরখাস্ত কর্মকর্তাদের চারজন– মোরেলগঞ্জের সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মীর এনামুল হক, সৌমেন সরকার, মদন কুমার দাস ও হাসানুজ্জামান। বাকি দুজন হলেন একই কার্যালয়ের সাবেক অডিটর শ্যামল কুমার দাস ও রুবেল মোল্লা।
তাদের মধ্যে মীর এনামুল রামপাল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত; সৌমেন সরকার খুলনার তেরখাদা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা; মদন কুমার বাগেরহাটের ডিএএফও অফিসের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার; হাসানুজ্জামান খুলনা বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে কর্মরত। অডিটর শ্যামল কুমার বর্তমানে বাগেরহাটের মোংলায় এবং রুবেল মোল্লা একই জেলার শরণখোলায় কর্মরত।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মীর এনামুল হক অনলাইন সিস্টেমে নিজের ইউজার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ৫২টি জিপিএফ ফান্ডের অগ্রিম বিলের বিপরীতে জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়েছেন চার কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা। সৌমেন সরকার একইভাবে ৩টি অগ্রিম বিলের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মদন কুমার ৫টি অগ্রিম বিলের বিপরীতে ১২ লাখ টাকা এবং হাসানুজ্জামান দুটি অগ্রিম বিলের বিপরীতে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
অডিটর শ্যামল কুমার ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৬৫টি ভুয়া বিল তৈরি করে চার কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। রুবেল মোল্লা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।
জানা গেছে, মোরেলগঞ্জের কয়েকজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিপিএফ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে তাদের হিসাবে গরমিল দেখতে পান। পরে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাইয়ে খুলনার ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই কমিটি গঠন করা হয়।
কয়েকজন শিক্ষকের অভিযোগ, জিপিএফের অর্থ নিয়ে এ ধরনের লেনদেন বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না। ঋণ উত্তোলনের সময় হিসাব যাচাই করতে গিয়ে গরমিল দেখতে পান। কোনো কোনো শিক্ষকের হিসাবে একই দিনে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী এ প্রতিবেদককে জানান, গ্র্যাচুইটি বা আনুতোষিকের টাকা আত্মসাৎ করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে এ ধরনের গুরুতর অপরাধ যে কর্মকর্তারা করেছেন প্রাথমিক তদন্তে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে। শিক্ষকদের খোয়া যাওয়া টাকা ফেরত দেয়া হবে কিনা
এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত পরবর্তী এটা একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত দেয়া হবে।

