Opu Hasnat

আজ ৯ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার ২০২৩,

ব্রেকিং নিউজ

তিস্তা সেচ খাল সংস্কারে প্রায় ৪ লাখ বৃক্ষ নিধন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা খেলাধুলা

তিস্তা সেচ খাল সংস্কারে প্রায় ৪ লাখ বৃক্ষ নিধন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

তিস্তা সেচ এলাকায় চাষাবাদ বৃদ্ধিতে সেচ খালগুলো সংস্কার কাজে উভয় পাশের সামাজিক বনায়নের প্রায় ৪ লাখ বৃক্ষ নিধনের প্রক্রিয়া চলছে । এতে প্রাকৃতিক বির্পযয়সহ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পরবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকার মানুষ। 

সূত্র মতে, তিস্তা নদীর পানি কৃষিতে ব্যবহারের জন্য ১৯৯১ সালে  সৈয়দপুর, রংপুর, দিনাজপুর,  নীলফামারী, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জসহ ১২ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে দিনাজপুর সেচ খাল, বগুড়া সেচ খাল, রংপুর সেচখাল, এস সেভেনটি খাল, এস ফোরটি খাল,  এস সিক্সটি খাল, টি-২ এস সেভেনটি খাল, তিস্তা প্রধান সেচ খাল, এস ও আর সেচ খাল, এস টু আর সেচ খাল, এস ফাইভ ডি সেচ খাল, এস এইটটি সেচ খাল, এস থ্রি-ডি সেচ খাল, বিসিথ্রি সেচ খাল ও এ সব খালের সাথে প্রায় ৪০ টি ক্যানেল খনন করা হয়েছে। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশির ভাগ শাখা ও প্রধানখাল ও সংযোগ ক্যানেল নষ্ট হয়ে যায়। বনমন্ত্রনালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় সমন্বিত ভাবে নানা শর্তে চুক্তিভিত্তিক এ সব খাল ও সংযোগ ক্যানেলগুলোর উভয় পাশে সামাজিক বনায়নের বৃক্ষ রোপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । মেয়াদ পূর্তিতে সেগুলো কেটে পুনরায় রোপন করা হয় চারা। 

এভাবে স্থানীয় বনবিভাগ ও উপকারভোগীর মাধ্যমে ২০০২ সাল থেকে  ২০২০ সাল পর্যন্ত আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস, জারুল, পারুল,বহেলা, হরতকি, নারকেল, আম, জাম, বট, ডুমুর, গামার, গুটি, মেহগনি, কাঠালসহ বিভিন্ন প্রজাতীর বনজ, ফলদ ও ওষুধী গাছ রোপন করেন সুবিধাভোগীরা।

এতে কয়েক বছরেই উত্তরের ওই সকল এলাকার প্রকৃতিকে সবুজের সমারোহ ছড়িয়ে পড়ে । গ্রীস্মের তপ্ত রোদে খালের বাধে সবুজ ছায়ায় কিষাণ-কৃষানী, পথচারিরা এর সুশীতল ছায়ায় সময় কাটান। বিকালে দলবদ্ধ  আড্ডায় মেতে ওঠেন স্থানীয়রা। খাল-ক্যানেলে বহমান পানি ও তার বাঁধে সবুজ বনায়ন ভিন্ন সৌন্দর্যের আবহ তৈরী করে । সেখানে অনাবিল আনন্দে মাতোয়ারা থাকত সবাই ।
তবে কৃষিতে পানি সরবরাহ বৃদ্ধির নামে বিশাল এলাকাজুড়ে সামাজিক বনায়নের বৃক্ষরাজি ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছে সংশ্লিষ্টরা।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: মতলুবুর রহমান জানান, কৃষিতে ফলন বাড়ানোর লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই প্রকল্পের গাছগুলো সড়াতে হচ্ছে। কারণ এই শর্তে সেখানে  গাছ রোপন করা হয়েছিল। তবে এভাবে গাছ নষ্ট করার বিষয়ে চিন্তায় আছি। যদিও বিশাল এ বনায়নের গাছ অপসারণের পর আবারও লাগানো হবে। যা দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। এতে প্রকৃতিতে বিরুপ প্রভাব পরলেও করার কিছুই নেই।  জনবল স্বল্পতার কারণে বিভিন্ন এলাকার বিশাল সামাজিক বনায়নের গাছগুলো অপসারণ প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।

পর্যায়ক্রমে ব্লেজিং, নাম্বার বসানো, পরিমাপ এবং টেন্ডারের পর বিক্রি করা হবে। এতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এ সবের কোন কিছুই মানতে চায়না পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞে বাঁধে প্রায় লক্ষাধিক গাছ কাটার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি অনেক এলাকায় ব্লেজিং, নাম্বারিং ও পরিমাপ করা গাছগুলোকে এস্কেভেটর মেশিন দ্বারা বিশাল মাটির স্তুপের নিচে ঢেকে দিচ্ছে। আর এমন দৃশ্য দেখা গেছে সৈয়দপুরের বগুড়া খালের চৌমুহনি এলাকায়। এখানে টেন্ডার হলেও সঠিক মুল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন উপকারভোগী ও বনবিভাগ । ওই বনায়নের উপকারভোগী দলের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, গাছগুলো খাল থেকে অনেক দুরে।

এমনকি বাঁধের এক কিনারে। তাদের খনন ও বাঁধ পুন:নির্মাণ কাজে কোন সমস্যা হত না। তারপরেও এ  গাছগুলো অপসারনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। গাছকে ধ্বংসের নির্দেশদাতারা দেশপ্রেমিক হতে পারে না। তারা শুধু পকেট ভারি করতে পানি উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

মোহাইমিনুল ইসলাম ঝন্টু নামে উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের সামাজিক বনায়ন এলাকার সভাপতি জানান, আমাদের বাগানটি সংযোগ ক্যানেলের দুই ধারে ১৫ কিলোমিটারে ১৫ হাজার চারা ২০১৯ সালে রোপন করা হয়েছে। ৭৫ জন উপকার ভোগীর নিয়মিত যত্নে গাছগুলো ১২ থেকে ১৫ ফুট উচু হয়েছে। এগুলো বিক্রি করলে চুলার খড়ি ছাড়া কিছুই হবে না। কিভাবে তারা এই অপুষ্ট গাছগুলো নিধন করবে? বিষয়টি ভাবলেই চোখে পানি আসছে।

এদিকে, তিস্তা সেচ প্রকল্প এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক ফসল উৎপাদনে সংশ্লিষ্টরা সেচের পানি নিশ্চিত করতে ২০২১ সালে  ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প হাতে নেয়। পরবর্তিতে ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল তৃতীয় দফায় ভার্চুয়াল আলোচনার মাধ্যমে চুড়ান্ত হয় এ প্রকল্পের রুপরেখা।

১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই বছরই তড়িঘরি করে শুরু করেন তাদের সব খাল ও ক্যানেলের সংস্কার কাজ। যার মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সেখানে ৭৬৬.৩১ কিলোমিটার ‘ডাইক’ পুনবার্সন ও শক্তিশালীকরণ , ৭২ কিলোমিটার সেচ পাইপ স্থাপন, প্রটেকশন বাঁধ ১০ দশমিক ০৮ কিলোমিটার ও মেরামত করা হবে ১.০৬ কিলোমিটার। সাথে বাইপাস সেচ খাল নির্মাণ করা হবে ৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার। পাশাপাশি ২৭টি কালভার্ট, ৪টি সেতু নির্মাণ ও ২৭০ হেক্টর জলাধার ও সাড়ে নয় কিলোমিটারের চ্যানেল পুনঃখনন, ৬ কিলোমিটার পরিদর্শন, ৫২.২৯ কিলোমিটার পরিদর্শন সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, ৫৭টি নিকাশ কাঠামো নির্মাণ ও ৩টি মেরামত, ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ ও ৬টি রেগুলেটর মেরামত এবং ১৮টি অনাবাসিক ভবন মেরামতের পর ৮৭ হাজার গাছ রোপণ করতে হবে। তবে ওই সকল খাল ও ক্যানেলে বিদ্যমান সামাজিক বনায়নের প্রায় ৪ লাখ বৃক্ষ অপসারন করতে হচ্ছে বন বিভাগকে। আর বিশাল সংখ্যক বৃক্ষরাজি ধ্বংস করায় উত্তরের এ জনপদে চলতি মৌসুমেই প্রকৃতির উপর বিরুপ প্রভাব পরতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হাকিম বলেন, প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলে গ্রীস্মকালে উষ্মতা বাড়ছে। গত বছর গড় তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন ৩৫ ও সর্বচ্চ ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ফারেনহাইট।  এতে  প্রচন্ড দাবদাহ হয়েছিল। আর বিশাল এলাকার সবুজ বৃক্ষ কর্তন করা হলে আগামিতে এ অঞ্চলে মরুকরণের আশংকা রয়েছে। তাই এখনই সচেতন হওয়া উচিত।

উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন খোকন বলেন, ভুপৃষ্ঠে ৩০ শতাংশ বনভূমি বা বনাঞ্চল প্রয়োজন । গাছই হচ্ছে ধরণীর ফুসফুস। গাছ থেকে অক্সিজেনের পাশাপাশি এর ছায়া মাটিকে আর্দ্র ও চারপাশের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখে। তাই বৃক্ষ নিধন হলে আর্দ্রতা কমে শুকিয়ে যায় গাছপালা। বিপর্যয় ঘটে প্রকৃতির। যার কারণে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়। প্রকৃতি ও মানবকল্যাণে গাছ নিধন করা উচিত নয়।  সরকারকে ধোয়াশায় রেখে এই উন্নকর্মকান্ড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সুত্র মতে, এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণের কারণে বনভূমি কমায় তাপমাত্রা বাড়ছে। দেশের উপকূলীয় নিম্ন এলাকা সাগরের লোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর মরু অঞ্চলে বরফ গলার কারণে নতুন নতুন অণুজীব অবমুক্ত হয়ে সংক্রামক ব্যাধি বাড়ছে। তাই বৃক্ষ নিধন প্রানীদের অস্তিত্ব সংকটে পরতে পারে। 

এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গাছ ধ্বংস করলে এর মধ্যে বসবাসকারী  প্রাণীদের ব্যাধি  মানবদেহে সংক্রমিত হবে। যার উৎকৃষ্ট দৃষ্টন্ত হচ্ছে মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব।

ইউনিভার্সিটি অব মাতো গ্রাসোর ইকোলজিস্ট আনা লুসিয়ের মতে, কোনো নতুন ভাইরাস প্রাকৃতিক আবাস ত্যাগ করলে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এতে নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আর বন উজাড়ে বাদুড়ের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় এমন হয়েছিল বলে জানান তিনি।