Opu Hasnat

আজ ৩ অক্টোবর সোমবার ২০২২,

গ্লোবাল ভিলেজে মর্যাদার অহংকার মতামত

গ্লোবাল ভিলেজে মর্যাদার অহংকার

সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : পদ্মা সেতু প্রাণবন্ত স্মৃতিময় ইতিহাসে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কানেক্টিভিটি দূরুত্বটা কমিয়ে দিল। সাথে দিবে ইন্টারনেট গতি যা আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে। সেই সাথে বেড়ে যাবে মাল্টিপল কানেকশন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন শিল্প বিকাশে অভাবনীয় প্রভাব ফেলবে। যা এখনই বিশ্ববাসী অসাধারণ ৬.১৫ কিলোমিটার নয়নাভিরাম দীর্ঘ এ পদ্মা সেতুর স্যাটেলাইট ভিউ স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের অহংবোধ, আবেগ ও আভিজাত্যের জৌলুস। ভলান্টিয়ার কমিউনিটি লোকাল গাইডদেও অক্লান্ত পরিশ্রমে গুগুল ম্যাপসে পদ্মা সেতু যুক্ত হওয়ায় এর সুফল হিসেবে পদ্মা সেতুতে যাওয়ার দিক নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে সেতুর দু’পাশের টোল প্লাজায় যানজটের সার্বিক অবস্থা। এছাড়াও সেতুর সব কয়টি রুটম্যাপও ঘরে বসে অতি সহজে ম্যামরিতে নেয়া যাচ্ছে। এক কথায় বলতে পারি ডিজিটাল শিল্পায়নের বিস্তার লাভ। প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগুলের ওয়েবম্যাপিং প্লাট ফরম গুগুল ম্যাপসে ঠাঁই কওে নিয়েছে বাংলাদেশের গর্বের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এটি গ্লোবাল ভিলেজে আমাদেও মর্যাদার অহংকার।

বহুল আলোচিত বিশ্বব্যাংক জুন ২০১২ খ্রিস্টাব্দে পদ্মা নদীর উপর সেতু নির্মাণ ঋণ বাতিল করলে সরকার সে বছরেই জুলাই মাসে দেশের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নিমার্ণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এ পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ ছিল বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ১৭ জুন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পদ্মা বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতুটি বাস্তবায়ন করতে প্রকল্পটি গ্রহণ করে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং ১৭ জুন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মূল সেতু নির্মাণ কাজের জন্য চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’র সঙ্গে চুক্তি হয়। ৩০’ হাজার, ১৯৩’ কোটি, ৩৯ লাখ টাকা ব্যায় করে এ প্রমত্ত পদ্মাকে ম্যানেজ করতে ‘‘গাইড ব্যান্ড উইথ ফলিং এ্যাপ্রোন’’ নামক প্রযুক্তি প্রকৌশল অবলম্বন করে ৩২ মিটার গভীর খনন করা হয়। পদ্মাকে নিজ শাসনে রেখে পাইলিং এর কাজে জিপিএস প্রকৌশল ব্যবহার করে ১২২মিটার পাইলিং খনন করা হয়। যা চল্লিশ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। 

৯’ মাত্রার ভুমিকম্প সহনীয় ও রোধে সেতু তৈরিতে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অর্থাৎ ‘‘ফ্রিকশান পেন্ডুলাম বিয়ারিং বা এফপিবি প্রযুক্তি’’। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেতু নির্মাণ খরচ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার কমিয়ে আনা হয়। আরো কমিয়ে আনা হয় চারশত মিলিয়ন ডলারের ফেরি সার্ভিস খরচ। সব চাইতে বেশি কমিয়ে আনা হয় দক্ষিাণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের অত্যন্ত মূল্যবান সময় খরচকে আর বাড়িয়ে দেয়া হয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর সাথে কৃষি উন্নয়নে যোগাযোগের সেতুবন্ধন। যে সিঁড়ির অভাবে দেশের দক্ষিণ শষ্যভান্ডারের প্রান্তিক কৃষক অসহায় ছিলেন, আজ তারা হাতে তাঁদের স্বপ্নের চেরাগ পেয়েছেন। দ্রুত তাদেও সবুজ বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। বিকশিত হবে প্রাণি সম্পদ, মৎস সম্পদ এবং অভাবনিয় পাট রপ্তানি বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে জিডিপি, এসডিজি আর বাড়বে দেশের মানুেষর গ্লোবাল ভিলেজে মর্যাদা।

স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবজ্জল ইতিহাসের অন্যতম এ অধ্যায়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, চার বারের মত নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, মানবতার মা শেখ হাসিনা সময়চিত সাহসী সিদ্ধান্তের বড় অর্জন বা ফসল আজকের বহুমুখী সড়ক ও রেল পদ্মা সেতু। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর অপার সম্ভাবনায় দখিণের উন্মোচিত এ দুয়ার বার বার ২৫ জুনের কথা মনে করিয়ে দেয়। নিয়ে যায় ইংরেজি এস অক্ষরের ন্যায় নক্সায় তৈরি স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে। যেখানে তৈরি করা হয়েছ পদ্মা সেতুর নক্সার ন্যায় সেতু উদ্বোধন মঞ্চ। যে পদ্মা পারের বির্স্তীন এলাকা সেজেছে বর্ণিল সাজে। নানা রঙের ফেস্টুন আর ৮০টি লাল-সবুজের নৌকা পদ্মা পাওে হাসি-মুখে অপেক্ষমান পদ্ম কন্যার জন্যে। বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর আনন্দে হাজার হাজার মানুষ ইতিহাসে স্বাক্ষী হতে দীর্ঘ সময় ধওে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেতু উদ্বোধনী মূল্যবান কথা শোনার জন্য উৎসুক। অন্যদিকে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তের বাঙালিসহ অনান্য জাতির কোটি কোটি মানুষজন জাকজমক আয়োজনে প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য শনিবার দিনের প্রথম প্রহরে বিভিন্ন টেলিভিশন পর্দায় চোখ রাখেন।

অবশেষে টোল দিয়ে প্রধানমন্ত্রী গাড়ি বহরসহ মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে সেতু সড়কে প্রবেশ করলেন। এ সময় পদ্মা জয়ের আনন্দে ঐতিহাসিক এ অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বাসিত দেশের আপামর জনতা। উচ্ছ্বাস প্রকাশে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেনি জনস্রোত। নীল আকাশে লাল-সবুজ পতাকার অববয় ফুটিয়ে ৩১টি বিমান মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লেপ্র দর্শন কওে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনন্দ চিত্তে এ দৃশ্য উপভোগ করেন। এ অনুভূতি একটি প্রবন্ধ লিখে বোঝানো কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। উদ্বোধনী ফলক ও মুর‌্যাল-১ উন্মোচনের মাধ্যমে সেতুর উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। পদ্মায় দৃষ্টিনন্দন নৌকা বাইচের বহর, পদ্মাপারের উৎসব সারাদেশবাসী বর্ণিল সাজে মাতে এবং সেতুর এ শুভ উদ্বোধন উদযাপন করে। প্রাণের এ উৎসব সমগ্র দেশের হাট-বাজার, অলি-গলি, রাস্তা-ঘাট ছেয়ে যায় পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড আর তোরণে। যতদূর চোখ যায় যেন রঙের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন স্থানে করা আলোক সজ্জা মরিচ বাতিতে উজ্জ্বল সেতু, নৌকা আর জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতিসহ বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে-উল্লাসে ভাসে দেশের মানুষের হৃদয়। কার সাধ্যি ঠেকাবে।

মুন্সিগঞ্জের বহুল প্রত্যাশিত স্বপ্নের এ পদ্মা সেতু উদ্বোধন বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকে পদ্মার বুকে জ্বলে উঠেছে লাল নীল সবুজ সোনালী আলোর ঝলকানি। ৪২টি স্তম্ভ, এ স্তম্ভ যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, কেউ দাবায়ে রাখতে পারবানা। কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। আমরা বিজয়ী হয়েছি। তিনি আরো বলেন আমাকে সেতু তৈরিতে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে আমার দেশের জনগণ। সকল প্রকার ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে স্বপ্নের দ্বার খুলে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে সেতু উপহার দিয়ে আবার দেশবাসীর প্রতিই কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পদ্মকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা কওে এবং ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমরা আজ এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি। এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু যে দুই পারের বন্ধন সৃষ্টি করেছে তা নয়, এই সেতু শুধু ইট-সিমেন্ট, স্টিল-লোহা-কংক্রিটের একটা অবকাঠামো নয়; এই সেতু আমাদের অহঙ্কার। এই সেতু আমাদের গর্ব, এই সেতু আমাদেও সক্ষমতা এবং আমাদের মর্যাদার শক্তি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য কীর্তি গাথার দৃঢ় সংকল্প ও দূরদর্শিতার ভ‚য়সী প্রশংসা করে অভিনন্দন জানান ভারতীয় হাইকমিশন, চিন, সৌদি আরব, যুক্তরাস্ট্র্রসহ দেশি-বিদেশি কুটনৈতিকবৃন্দ। বিশ্বের চোখ এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি। এটি বাঙালি জাতির একটি বড় মর্যাদার অহংবোধ। শুধু তাই নয় বিশ্ববাসীর কাছে উচ্চ মর্যাদার আসনে বসেছে আমার প্রিয় সোনার বাংলাদেশ, আমার ডিজিটাল বাংলাদেশ। এ কাজটি দক্ষতার সাথে করেছেন বীর কান্ডারী জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা আধুনিক বাংলাদেশের রুপকার, জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টেকসই বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশবাসীকে সেতু উপহার দিয়ে সফল রাষ্ট্র নায়কের পরিচয় বহন করেন।

এ সেতু আমাদের প্রয়োজনীয়তা এবং জনগনের সম্পদ। সেতুটি বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক ও উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই সচেতনতার সাথে এ প্রয়োজনীয় মূল্যবান সম্পদ রক্ষা করা, এর সুষ্ঠ ব্যবহার করা, সেতুর প্রতি দ্বায়িত্বের সাথে যত্নবান হওয়া দেশের সকল নাগরিকের একান্ত কর্তব্য। বিষয়টি আমলে নিয়ে সেতু পারাপারকারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষকগণ এবং খুতবায় ইমামগণ একটি বৃহত্তর ও ক্যম্পেইন গড়ে তুলতে পারলে সর্বস্তরের জন জীবনে সচেতনতা বেড়ে সেতুর গুরুত্ব বহন করবে। সেতুতে দূর্ঘটনা এবং সেতুর প্রতি অপপ্রচার অচীরেই কমে যাবে।

২৫’ জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দে, ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধুই একটি সাধারণ দিন নয়, বরং এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ঐতিহাসিক দিন। এ দিনটিকে ঘিওে ছিল অন্তহীন উচ্ছ্বাস ও আবেগপূর্ণ পরিবেশ। ছিল দেশব্যাপী সকল মানুষের হৃদয় জুড়ে এক অসাধারণ অনুভূতি। যে অনুভূতি হৃদয়ে ধারন করা সম্ভব কিন্তু কলমের কালি দিয়ে লিখেতা বোঝানো সম্ভ নয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, সংগঠক, সম্পাদক, প্রকাশক, গবেষক ও কবি।